রায় ঘিরে দলভাঙ্গার ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলা!

দেশের চোখ ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের দিকে। এ নিয়ে বিএনপিতে চলছে অবিশ্বাসের যুদ্ধখেলা। মামলার সাজার চাইতেও বিএনপি প্রধান মহাআতঙ্কে দলভাঙ্গার ষড়যন্ত্রে। অন্ধকার সময়কে আলোতে ফেরাতে দৃঢ়বলে চলছেন তিনি। জনপ্রিয়তায় ঘরের ফসল তুলতে তিনিও হাটছেন গতিপথে। একাধিক বৈঠকের পর সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার জিয়ারতও করেছেন তিনি।

এ রায় ঘিরে বিএনপির শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার হচ্ছেন। অন্যদিকে যারা আছেন তাদের নিয়ে চলছে নজিরবিহীন অবিশ্বাসের খেলা। হওয়ারই কথা বহুদিন থেকে স্থায়ী কমিটির নেতারা ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দেয়ায় দলে অনাস্থা, দ্বন্ধ স্পষ্ট। অন্যদিকে বিএনপির অতীতে ভূমিকায় জামাতও হাটছে অন্য পথে। বসে নেই ক্ষমতাসীনরাও।

আবার এ-ও বলতে হচ্ছে লাল সবুজের স্বাধীন বাংলাদেশে স্পর্শকাতর বহু মামলার সাজা হয় না। আসে না বিচারকার্যে তালিকায়। হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি বিচার হয় না। কিন্তু মাত্র দুই-তিন কোটি টাকার মামলার রায় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সাধুবাজ। বয়সভারে বেগম জিয়া দৃঢ়তা, শক্তি-সামর্থ্যে এবং শারীরিক-মানসিকেও দারুণ মরিচায় ধরেছে। হওয়ারই কথা যিনি স্বামী হারিয়েছেন বহু আগে। ওপারে চলে গেছেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। আর বড় সন্তান তারেক রহমান লন্ডনে থেকেও না থাকার তালিকায়, পারছেন না দেশে আসতে। এখন বেগম জিয়ার কাছের মানুষ কেউ নেই বললেই চলে।

এ রায়কে কেন্দ্র করে সরকার অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে ভালোই প্রস্তুত রয়েছে তার দৃশ্যপট ভালোই বোঝা যাচ্ছে। যাতে ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের আগে-পরে বিএনপি আন্দোলন করতে না পারে। এখন তা খুবই দৃশ্যত যে সরকারের পরিকল্পনা কি। পুলিশ অ্যাকশন গতিপথেই রয়েছে। ঘটনা ঘটছে ঢাকায়, পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করছে সারা দেশে। শান্তিপূর্ণ বৈঠকেও নেতাকর্মীদের আটক করা হচ্ছে। বিএনপি প্রধানের নিরুত্তাপ গাড়িবহর থেকেও আইনজীবী ও নেতাদের আটক করা হচ্ছে। দেশব্যাপী চলছে গ্রেফতারের মহোৎসব।

সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে বিএনপি চেয়ারপার্সনও কৌশলী কর্মযজ্ঞে চলছেন। তার ধারাবাহিকতায় গত রোববার লা মেরিডিয়ান হোটেলে কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হলো। সেখানেই আসলো বিএনপির জন্য আদর্শিক পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত।সেদিন তৃণমূলের নেতারা বলেছেনও বটে, আন্দোলন শুরুর আগেই বিশ্বাসঘাতকদের চিহ্নিত করতে, না হলে আবার বিপদে পড়তে হবে। কারণ বিএনপির কোন নেতা সরকারের কাছ থেকে ব্যবসা পাচ্ছেন, ব্যাংক লোন মওকুফ পাচ্ছেন, বিএনপির কোন নেতা সরকারের সাথে বৈঠক করছেন, ইত্যাদি সব খবর তৃণমূল নেতারাও রাখেন বলে জানিয়েছেন।

তবে তৃণমূলের আস্থায় বিএনপি নেত্রীও বলেছেন যথার্থ। ‘‘যারা বেঈমানি করবে, যারা এদিক-ওদিক, এক পা এদিক অন্য পা অন্যদিকে রাখতে তাদের চিহ্নিত করা যাবে। এদের মূল্যায়নের জায়গা থাকবে না। এদের তারাও (সরকার) নেবে না, আমরাও নেবো না। আমরা আগে একবার ক্ষমা করেছি, ক্ষমা বার বার হয় না।”

‘‘আমি খোঁজ রেখেছি যারা অতীতে আন্দোলন করেছে, দলের জন্য কাজ করেছে, দলের সাথে বেঈমানি করেনি তাদেরকে ভবিষ্যতে ভালো জায়গা দেয়া হবে। যদি বিএনপি অংশগ্রহন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে তাদেরকেও মূল্যায়ন করা হবে।”

এবার আসি অবিশ্বাসের কিছু বক্রপথে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কিছুটা গঠনমূলক রাজনৈতিক ইমেজ আছে তবে ভালো রাজনৈতিক দর্শনে ভালোই ঘাটতি আছে। সাম্প্রতিক সময়ে তার কিছু কর্মেও রয়েছে সন্দেহের তীর। আর মওদুদ আহমদতো বহু আগ থেকে অবিশ্বাসীদের তালিকায়। দল ভাঙ্গার কোনো হোতার তালিকা আসলে তার নাম প্রথমে থাকবে বলেও ধারণা পাওয়া যায়। আর দলে দাপুটে স্থায়ী কমিটি সদস্য হলো মির্জা আব্বাস। কাদামাটি কিংবা রোদ-বৃষ্টিতে সব সময় ধবধবে পাঞ্জাবী পরেন। ঢাকায় রাজপথমুখী আন্দোলনের সব চাইতে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীও তিনি এমন কথা দলের সিনিয়র নেতাদের মুখে পাবলিক পার্লামেন্টে বহুবার শোনা গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য তরিকুল ইসলাম এখন গুরুতর রোগে আক্রান্ত। দলের কোনো কর্মসূচিতেও এখন তাকে খুব একটা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহাবুবুর রহমান বিএনপিতে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত। দলের চেয়ারপার্সনের রায়ে রাজপথ তো নয়, সভা সেমিনারেও প্রতিবাদ কিংবা কথা বলছেন না তিনি।

তবে মাঝেমধ্যে টকশোতে দেখা যায় স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিঞা। তিনিও কিছুটা অসুস্থ। দলের এই দুঃসময়ে তিনিও রাজনীতি কিংবা রায় নিয়ে কোনো মুখ খুলছেন না। বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে কারো নাম আসলে সবার আগে চলে আসে ড. আবদুল মঈন খান এর নাম। সম্প্রতিতে তার নীরবতাও দলের জন্য মহাহুমকি।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন তিনি ব্যবসা স্বার্থকেই সবচেয়ে বেশী অগ্রাধিকার দেন দলে এমন কথা বহুদিন থেকেই প্রচলিত। দলে ভূমিকা রাখার আগেই গ্রেফতার হয়ে গেলেন তিনি। আরেক সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ তিনি তো থেকেও নেই।

দলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা থেকে বিরত আছেন শীর্ষ কিছু ভাইস চেয়ারম্যানও। তার মধ্যে মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন, আবদুল্লাহ আল-নোমান, আব্দুল আউয়াল মিন্টুর নাম বিএনপি পাড়ায় সবার মুখে মুখে। তবে কিছু প্রশংসনীয় মুখও রয়েছে তার মধ্যে ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবতার মাঠে তার ভূমিকা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানও ভূয়সি প্রশংসা করেছেন। আদালত ও পল্টন কেন্দ্রিক সব প্রোগ্রামেও সরব উপস্থিতি তার।

অন্যদিকে শামসুজ্জামান দুদু ছোট-বড় সব প্রোগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের ভূমিকা ও রায় নিয়ে দলের পক্ষে কথা বলে বিপ্লবী ভূমিকায় আছেন।

এদিকে লন্ডনে রয়েছে যুদ্ধাপরাধে কারাদণ্ডে দণ্ডিত এবং কারাগারে মৃত মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ এবং গোলাম আজমের সন্তানরা। রয়েছে আরো কিছু জামাত বুদ্ধিজীবী ব্যাক্তিরাও। দেশে আন্দোলন জমাতে তাদের সাথে তারেক জিয়া বৈঠক ও যোগাযোগ করেও কোন সুফল মিলছে না রাজনীতি পাড়ায় এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।

যুদ্ধাপরাধী সন্ত্রানদের বক্তব্য ‘তাদের পিতাদের যখন সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছিল, তখন বিএনপি নীরব ছিলো। একটা বিবৃতিও দেয়নি। হরতালে সমর্থন কিংবা কোনো সহানুভূতিও জানানো হয়নি। তাই জোটে থাকলে তারাও এখন দলীয় আদর্শ ও কৌশলে পথ ধরছেন।

বিএনপির এই বিশ্বাস অবিশ্বাস খেলায় এখন নতুন করে তারেক রহমান, রুহুল কবির রিজভী ও শিমুল বিশ্বাসকে নিয়ে পদের মর্যাদা দেয়া, সম্মান দেয়া ও সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার নিয়ে কিছুটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তারেক জিয়া লন্ডনে থাকলেও দলের ভাইস চেয়ারম্যান হয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা তারই সবচেয়ে বেশী।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তারেক জিয়ার সবচেয়ে বড় আস্থাভাজন। দলের অন্য সিনিয়র নেতাদের চাইতে রিজভীর সঙ্গেই কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তারেক। শিমুল বিশ্বাস দলের ভারী কোন পদে না থাকলেও এই দলের অন্যতম নিয়ন্ত্রক বটে। বিশেষ করে গুলশান কার্যালয় কীভাবে চলবে সব’ই নাকি তার ইঙ্গিতে হয়। এমন কর্মকাণ্ডে দলের অনেক সিনিয়র নেতাই নীরব যন্ত্রণা বুকে নিয়ে নিশ্চুপ হয়ে আছেন।

তবে দলের এমন হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্যেও বিএনপির আছে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা। আছে সূর্যমুখী ফসল। শুধু অপেক্ষা ঘরে তোলা। তৃণমূলে বিএনপির এই ফসল ঘরে তুলতে দলের চেয়ারপার্সন সময়ের আদর্শিকপথে হাটছেন। এই শক্তির ফসল ঘরে তুলতে সব কিছু ভুলে আন্দোলনমুখী হওয়াই এখন বিএনপির জন্য সুবর্ণপথ।

লেখক: আবদুর রহিম

সাংবাদিক