কেমন হবে নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মুলা ?

নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এরপরই  বিরোধী রাজনীতিক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা নানা মত দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো ব্যাখ্যা নেই। অনেকে আবার ভিন্নমত পোষণ করছেন। তারা বলছেন, বাহাত্তরের সংবিধানেই সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ফর্মুলা দেয়া আছে।

সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের চার দফায় এই ফর্মুলা এখনো বহাল। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সমঝোতার ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, এতে একটি সমঝোতার খুব অল্প হলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনকালীন সরকার বলে সংবিধানে কিছু নেই। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার সমঝোতা সবাই চাইছে। আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রীর কথাটা তারই একটা ইঙ্গিতবহ বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। সেইভাবেই আলাপ-আলোচনার পথে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, সরকার হয়তো সংসদ রেখেই নির্বাচন করার পরিকল্পনা করছে। তাই তারা সেদিকে আলো ফেলতে চায় না। ৫৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংসদ ভেঙে যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এই অনুচ্ছেদের (২) বা (৩) দফার অধীন নিয়োগদানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভেঙে যাওয়ার অব্যবহিত পূর্বে যাঁরা সংসদ সদস্য ছিলেন এই দফার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তাঁরা সদস্যরূপে বহাল রয়েছেন বলে গণ্য হবেন।’
সংবিধান প্রণেতারা বলছেন, ওয়েস্টমিনস্টার মডেল গ্রহণের সময় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা চিন্তায় ছিল না। আর এ কারণেই নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়ার প্রসঙ্গ আসে।
বিরোধী বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ভিন্নমত পোষণ করেছে এক সংবাদ সম্মেলনে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, কিভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে সম্পূর্ণভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বোতভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে। বিএনপি আরো বলেছে, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী যদি সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে সেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। কারণ সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারও হবে বিদ্যমান সরকারেরই অনুরূপ।
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের উল্লিখিত ২ দফায় প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ এবং ৩ দফায় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের কথা বলা আছে। সেকারণে আগামী নির্বাচনের আগে সংবিধানের আওতায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা সর্বদলীয় সরকার হতে পারে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সাম্প্রতিক দাবি অনুযায়ী ৫টি মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেয়ার চিন্তা ছিল। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনের আগে তাদের ২০১৪ সালের মতো কোনো প্রস্তাব আর দেয়া হবে না বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের সংসদে বিএনপি ছিল, এবারে নেই। কিন্তু সরকার চাইলে টেকনোক্রাট বা উপনির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী করে এনেও নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা তা অবশ্য বলে না। এই নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির অংশগ্রহণের বিষয়টি আগাগোড়া একটি ‘তামাশা’ হিসেবে মনে করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনের আগে একটি নির্বাচনী মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। আর তাতে তিনি যাকে খুশি রাখবেন, যাকে খুশি বাদ দিতে পারেন।
১২৩ অনুচ্ছেদ বলেছে, সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে। তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না। বিএনপি এবারে নির্বাচনে গেলে যখন তারা ৩শ’ আসনে প্রার্থী দেবে, তখন আওয়ামী লীগের ৩শ’ নতুন প্রার্থীর সঙ্গে বিদ্যমান সংসদের ৩শ’ জন সাংসদরূপে বহাল থাকবেন।

সূত্র: মানব জমিন