ভালবাসা দিবসের বিকৃত ইতিহাস

মৃধা মোহাম্মদ: সঠিক ইতিহাস জাতির সামনে পেশ না করে বিকৃত ভাবে তুলে ধরা হয় । ইতিহাস হলো একটি জাতির দর্পন। ইতিহাস অসচেতন জাতি কোন দিন প্রকত দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে ঊজ্জীবিত হতে পারে না। বিকৃত ইতিহাস নিয়ে টেকশই জাতি গঠন করা যায় না। একটি জাতির যদি বিকৃত আচরণ করতে শুরু করে বা বিকৃতিকে প্রশ্রয় দেয় তখন সে জাতির পচন ধরে। সে রকম পচনের একটা নমুনা হলো বিশ্ব ভালোবাসা দিবস।

পশ্চিমা দেশগুলোতে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ বলা হয়। এ দিনটি কে ‘লাভ ডে অথবা ‘লার্ভাস ফেস্টিভ্যাল’ বলা হয় না। অথচ আমাদের দেশে‘ সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ (Saint Valentine’s Day) এর অনুবাদ করে বলা হচ্ছে ‘ভালবাসা দিবস’ এরূপ অনুবাদের কারণে এদেশের সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। ‘ভালবাসা’ একটি জনপ্রিয় শব্দ। ‘ভালবাসা দিবস’ বলায় এটা যে ভিন্ন দেশ ও ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে এসেছে সেটা সহজে বুঝা যায় না ।

একইভাবে অন্যান্য মুসলিম অধ্যূষিত দেশগুলোতে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ তার নিজ নামের পরিবর্তে অনুবাদের ছদ্মা বরণে প্রবেশ করছে। ফলে এ দিবসের প্রকৃত অর্থ, উৎপত্তির কারণ ও ইতিহাস মানুষের কাছে অজানা থেকে যাচ্ছে।
অনেকটা হুজুগের বশবর্তী হয়ে বিজাতীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতি-নীতিতে লালিত ও পরিপুষ্ট একটি ধর্মীয় উৎসবের দিনকে এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠি বিশেষ করে তরুণ ও যুবকরা নিজেদের একটি অন্যতম উৎসবের দিন হিসেবে গ্রহণ করছে! যা পরিকল্পিত ভাবে প্রবেশ করানো হয়।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে কিঃ

‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ এর আসল পরিচয় ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’(Saint Valentine’s Day) এর প্রথম শব্দটিই এ দিনটির আসল পরিচয় বলে দিচ্ছে। Advanced Oxford Learners’ Dictionary তে Saint শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে: a person declared to be holy by the Christian Church because of her/his qualities or good works অর্থাৎ: এমন ব্যক্তি, খৃষ্টান গীর্জা কর্তৃক যাকে তার গুণাবলী বা ভাল কাজের জন্য পবিত্র সত্তা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রতি শব্দ Ascetic বা সাধু, তাপস্বী। বাংলায় বলা হয় পবিত্র সত্তা।
আর Valentine শব্দের অর্থ ভালবাসা নয়। Valentine মূলত একজন ব্যক্তির নাম। খ্রীস্ট ধর্মের জন্য জীবন উৎসর্গ করার কারণে যাকে গীর্জা কর্তৃক Saint (পবিত্র সত্তা)ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। সুতরাং সহজেই বুঝা যায়, গীর্জা কর্তৃক ‘পবিত্র সত্তা’হিসেবে ঘোষিত একজন ধর্ম যাযকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন যে দিনটিতে করা হয় সেটাই সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’। যাকে বাংলাদেশে বলা হয় ‘ভালোবাসা দিবস’।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র ইতিহাসঃ

২৭০ খৃষ্টাব্দের কথা। সেন্ট বা সন্তো ভ্যালেন্টাইন নামের এক রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজক ছিলো। তিনি ধর্মযাজক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন একজন চিকিৎসক ৷ সে সময় রোমানদের সম্রাট ছিলো দ্বিতীয় ক্লডিয়াস ৷ তখন বিশ্বজয়ী রোমানরা একের পর এক রাষ্ট্র জয় করে চলেছে ৷

সাম্রাজ্যবাদী, রক্তপিপাষু রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের দরকার এক বিশাল সৈন্যবাহিণীর। এক সময় তার সেনাবাহিনীতে সেনা সংকট দেখা দেয়। কিন্তু কেউ তার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে রাজি নয়। কারন সমস্যা দাঁড়ায় মেয়েদের নিয়ে ৷ তারা যে নিজেরাও যুদ্ধে যেতে পারে না ।

আবার কিছুতেই পুরুষদেরও যুদ্ধে পাঠাতে চায় না ৷ সম্রাট লক্ষ্য করলো যে, অবিবাহিত যুবকরা যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে অত্যধিক ধৈর্যশীল হয়। তখন সম্রাট ক্লডিয়াস মনে করলো। পুরুষরা বিয়ে না করলেই বোধ হয় যুদ্ধে যেতে রাজি হবে ৷ তার ধারণা ছিল, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে যুদ্ধের প্রতি পুরুষদের অনীহা সৃষ্টি হয়।
তখন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস নারী-পুরুষের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ কিংবা যুগলবন্দী হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলো। যাতে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ না করে। তার ভাবনার আলোকে কাজ বাস্তবায়ন করলো । বিয়ে নিষিদ্ধ করলো সম্রাট ৷ তার এ ঘোষণায় দেশের যুবক-যুবতীরা ক্ষেপে যায়। যুবক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এক ধর্মযাজকও সম্রাটের এ নিষেধাজ্ঞা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু বিবাহ করার বয়সে তারুণ্যকে কি আর আইন করে বেধে রাখা যায়?

এগিয়ে এলেন রোমের খৃষ্টান গীর্জার পুরোহিত সেন্ট বা সন্তো ভ্যালেন্টাইন ৷ তিনি নিজে বিবাহ করার মতো সকল তরুণ -তরুনীদের এক করার ব্যবস্থা করলেন। আর্থাৎ’ বিয়ে দিলেন সবাইকে। তিনি রাজার আজ্ঞাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার গীর্জায় গোপনে বিয়ে পড়ানোর কাজও চালাতে থাকেন। একটি রুমে বর-বধূ বসিয়ে মোমবাতির স্বল্প আলোয় ভ্যালেন্টাইন ফিস ফিস করে বিয়ের মন্ত্র পড়াতেন।

কিন্তু সেই প্রথা বেশি দিন বজায় রাখতে পারলো না ৷ কারন ধরা পড়লো ভ্যালেন্টাইন ৷ তাঁকে বন্দী করা হলো ৷ ইতিমধ্যেই ভ্যালেন্টাইনর অনেক ভক্ত তৈরি হয়। তার৷
তাদের অনুরাগের চিহ্ন হিসেবে দিয়ে আসতেন অনেক ধরনের ফুলের শুভেচ্ছা ৷ তারা বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক কথা বলে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে উদ্দীপ্ত রাখত। যাতে তিনি ভেঙ্গে না পড়ে। এ ঘটনা উদঘাটিত হওয়ার পর তাকে রাজার কাছে ধরে নিয়ে আসা হয়। ভ্যালেন্টাইন রাজাকে জানালেন যে, খৃস্ট ধর্মে বিশ্বাসের কারণে তিনি কাউকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বারণ করতে পারেন না। রাজা তখন তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন।

কারাগারে থাকা অবস্থায় রাজা তাকে খৃষ্টান ধর্ম ত্যাগ করে প্রাচীন রোমান পৌত্তলিক ধর্মে ফিরে আসার প্রস্তাব দেয় এবং বিনিময়ে তাকে ক্ষমা করে দেয়ার কথা বলে। উল্লেখ্য,রাজা দ্বিতীয় ক্লডিয়াস প্রাচীন রোমান পৌত্তলিক ধর্মে বিশ্বাস করতেন এবং তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যে এ ধর্মের প্রাধান্য ছিল।
এক কারারক্ষীর অন্ধ মেয়েও ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে যেত।

অনেকক্ষণ ধরে তারা দু’জন প্রাণ খুলে কথা বলত। অন্ধ এ মেয়েটাও নানা কথা শুনিয়ে ভ্যালেন্টাইনকে উৎসাহ দিত। এক সময় ভ্যালেন্টাইন তার চোখের চিকিৎসা করে। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় অন্ধ মেয়েটি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। মেয়েটি তার প্রতি দর্বল হয়ে পরে । তিনি মেয়েটির কাছে একটি গোপন চিঠি লিখেন এবং শেষাংশে বিদায় সম্ভাষনে লেখা হয় ‘From your Valentine’ এটি ছিলো এমন একটি শব্দ যা হৃদয়কে বিষাদগ্রাহ করে।

ভ্যালেন্টাইনের ভালবাসা ও তার প্রতি দেশের যুবক-যুবতীদের ভালবাসার কথা সম্রাটের কানে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ২৭০ খৃষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি সৈন্যরা ভ্যালেন্টাইনকে হাত-পা বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে সম্রাটের সামনে হাজির করলে তিনি তাকে হত্যার আদেশ দেন। ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ ঘোষণা পরবর্তীতে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রীস্ট ধর্মের প্রাধান্য সৃষ্টি হলে খ্রীস্টান গীর্জা ভ্যালেন্টাইনকে ‘Saint’ হিসেবে ঘোষণা করে।

৩৫০ সালে রোমের যে স্থানে ভ্যালেন্টাইন কে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল সেখানে তার স্মরণে একটি গীর্জা নির্মাণ করা হয়। অবশেষে ৪৯৬ খ্রীস্টাব্দে খীস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু পোপ গ্লসিয়াস ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ (Saint Valentine Day) হিসেবে ঘোষণা করেন।

সে সময়, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে গীর্জায় খ্রীষ্টান ধর্মমতে পবিত্র সত্তা (Saint) নিবার্চনের জন্য একটি লটারীর আয়োজন করা হত। লটারীতে যার নাম আসত সে সংশ্লিষ্ট বছর থেকে গীর্জা ও খ্রীস্ট ধর্মের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করত ।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’ এর প্রেম প্রসঙ্গ
কথিত আছে,ভ্যালেন্টাইন কারাগারে থাকা কালে কারা রক্ষীর যুবতী মেয়ের প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েন। ২৭০ খ্রীস্টাব্দের ১৪ ফেব্র“য়ারি তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার দিন সে কারারক্ষীর যুবতী মেয়েকে একটি চিরকুট লিখে যায় যার শেষে লিখা ছিল, ” From Your Valentine” অর্থাৎ ‘তোমার ভ্যালেনটাইনের পক্ষ থেকে’। ভ্যালেন্টাইনের প্রেম সম্পর্কে এর চেয়ে বেশী কিছু জানা যায় না।

১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ ঘোষণার মূল কারণঃ
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কারারক্ষীর যুবতী মেয়ের প্রেমে ভ্যালেন্টাইনের কথিত ভালবাসার কারণে কি খ্রীষ্টান পোপ গ্ল্যাসিয়াস ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ঘোষণা করেছিলেন? নিশ্চয়ই না। কারণ,খ্রীস্ট ধর্মে পুরোহিতদের জন্য বিয়ে করা বৈধ নয়।পুরোহিত হয়ে কারো যুবতী মেয়ের প্রেমে আসক্তি খ্রীস্ট ধর্ম মতেও অনৈতিক কাজ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, ভালবাসার কারণে ভ্যালেন্টাইন কে কারাগারে যেতে হয়নি। কারণ, সে কারারক্ষীর যুবতী মেয়ের প্রেমে আসক্ত হয়েছিল কারাগারে যাওয়ার পর। সুতরাং, ভ্যালেন্টাইন কে কারাগারে নিক্ষেপ ও মৃত্যু দন্ড দান এর সাথে ভালবাসার কোন সম্পর্ক ছিল না। তাই ভ্যালেন্টাইনের কথিত ভালবাসা ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ এর মূল বিষয় ছিল না। বরং খ্রীস্ট ধর্মের প্রতি গভীর ভালবাসাই ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদন্ডের কারণ ছিল।

কারণ নারী-পুরুষের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে রাজার নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে তিনি গোপনে নারী-পুরুষের বিবাহ বন্ধনের কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে তার ধর্মীয় বিধান পালন করেছিলেন এবং অবশেষে তাকে জীবন দিতে হয়েছিল। আর খ্রীস্ট ধর্মের প্রতি তার এহেন গভীর ভালবাসার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেই মূলত তার মৃত্যুদন্ডের দিনটিকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।