কঠোর অবস্থানে সরকার: ঢাকায় ছাত্রদের ওপর লাঠিপেটা, টিয়ারশেল নিক্ষেপ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে ফিরিয়ে নিতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

আজ (সকালে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করছে। শিগগিরই সড়ক পরিবহন আইন পাস করা হবে। শিক্ষার্থীদের আর রাস্তায় থাকার দরকার নেই। পুলিশই দায়িত্ব পালন করবে।

তিনি আরো বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৃতীয়পক্ষ ঢুকে গেছে। একটি মহল ফেসবুকে গুজব ছড়াচ্ছে। যারা আগুন দিয়ে মানুষ মারতে পারে তাদের পক্ষে সবই সম্ভব। তাই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেন কেউ ভিন্নখাতে না নিতে পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

ট্রাফিক সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল

‘আমাদেরও ধৈর্যের সীমা রয়েছে’

এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাঝে হঠাৎ করে ঘোষণা দিয়ে রাজধানীতে আজ সকালে ট্রাফিক সপ্তাহের উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এ সময় তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে দিয়ে  বলেছেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। তার মানে এই নয় যে, তারা অরাজকতা করতেই থাকবেন, আর আমরা দৃশ্য দেখতে থাকব। মোটেই না, আমাদেরও ধৈর্যের সীমা রয়েছে। সেটা অতিক্রম করলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর দুপুর নাগাদ রাজধানীর জিগাতলা, ফার্মগেট উত্তরা ও রামপুরায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

দুপুরে ঝিগাতলা এলাকায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ের কাছে হেলমেট পরা কিছু যুবক লাঠি হাতে শিক্ষার্থীর ওপর হামলা চালায়।

এ সময় শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এবং  লাঠিপেটা করে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বেসরকারি এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ফার্মগেট মোড়ে যাওয়ার সময় মাথায় হেলমেট পরা কিছু যুবক  লাঠিসোটা নিয়ে মিছিলে হামলা করে। মুহূর্তেই মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

তাছাড়া, সকালে রামপুরায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে রামপুরার সড়ক অবরোধ করেন। এর কিছুক্ষণ পরই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার চেষ্টা চালালে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে হামলাকারীরা পিছু হটে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই হামলার সঙ্গে জড়িত।

ধানমন্ডি লেকে শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে পুলিশ

নিরাপদ সড়কের দাবিতে উত্তরার হাউজ বল্ডিং এলাকায় সকাল থেকেই জড়ো হন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। বেলা ১২টার দিকে কিছু ছাত্রলীগ কর্মী আশেপাশে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা তাদের ধাওয়া দিয়ে বের করে দেয়। তারা অবার হাঙ্গামা করতে এলে আন্দোলনকারীরা ছাত্রলীগ কর্মীদের মারধর করে এবং তাদের  তিনটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে।

রাজধানীর মিরপুরে কমার্স কলেজের ছাত্রদের একটি মিছিল থেকে ককটেল তৈরির সরঞ্জামসহ এক বহিরাগত তরুণকে আটক করে ছাত্ররা পুলিশে সোপর্দ করে।

ঝিগাতলায় আজকের হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী সহ বার্তা সংস্থা এপির ফটোসাংবাদিক এম এন আহাদ আহত হন। তাঁকে নিকটস্থ ল্যাবএইড হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।

এ সময় জিগাতলায় সীমান্ত স্কয়ারের দিকে পুলিশ সাঁজোয়া যান নিয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করে। কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচতে অনেক শিক্ষার্থী পার্শবর্তী লেকের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ সময় পুলিশ পাড়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে ও ঢিল ছোড়ে। কয়েকজনকে পানি থেকে টেনে তোলে পুলিশ। ওই সময় তিন শিক্ষার্থীকে ধরে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

গতকাল শনিবারও এই এলাকায় ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছিল। শনিবারের সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে, যাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

ওবায়দুল কাদের

হামলাকারীদের চুমু খাবে?

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, যারা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের দিকে হামলা করতে করতে আসবে, তাদের বলপ্রয়োগ না করে কি চুমু খাবে?

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আজকে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে অরাজনৈতিক আন্দোলন, সেই আন্দোলন কারা নোংরা রাজনীতির দিকে ‍নিয়ে যেতে চায়, সেটা গত তিন দিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে।

এর আগের আজ সকালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ—এই তিন দাবি নিয়ে পূর্বঘোষণা অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে এসে জড়ো হয়। মিছিলটি সায়েন্স ল্যাব হয়ে জিগাতলার দিকে যায়।

এই মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা জানান, জিগাতলায় তাঁদের অবস্থানের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁরা জিগাতলা থেকে ঘুরে আবার শাহবাগে ফিরে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু জাপান–বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের সামনে থেকে মিছিলটি ইউ টার্ন নেয়ার সময় পুলিশ আওয়ামীলীগ সভানেত্রীর অফিসের দিক থেকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া শুরু করে।

এ সময় আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থানরত দলের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমানসহ বেশ কিছু নেতা–কর্মী কার্যালয়ের বাইরে অবস্থান নেন।

পুলিশের রমনা জোনের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেছেন, মিছিলকারীরা ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে যাচ্ছিল। তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তারা শোনেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে টিয়ার গ্যাস ছুঁড়তে হয়েছে।

ওদিকে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের উপর্যুপরি হামলার প্রতিবাদে অহিংস মৌন মিছিল করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষকরা। রোববার দুপুর ১ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সামনে থেকে মৌন মিছিলটি শুরু হয়ে সিরাজী ভবনের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।

তাছাড়া, ঢাকায় আন্দোলনরত স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ময়মনসিংয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীরা।

আহত শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাচ্ছে সহপাঠীরা

২৯ ব্যক্তি ও নিউজ পোর্টালের বিরুদ্ধে মামলা

চলমান ছাত্র আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ২৯ ব্যক্তি ও নিউজ পোর্টালের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় এ মামলা করা হয়। রোববার সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার মাসুদুর রহমান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

খসরুর বিরুদ্ধে মামলা, নওমি গ্রেফতার

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে নাশকতায় উসকানি ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে।

এদিকে বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদের সঙ্গে ফোনে আলাপকারী কথিত মিনহানুর রহমান নওমিকে রোববার সকালে কুমিল্লা থেকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী।

এর আগে শনিবার দুপুরে আমীর খসরু সঙ্গে নওমি নামের ওই যুবকের ফোনের অডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওই অডিও রেকর্ডিং নিজের নয় বলে দাবি করেছিলেন আমির খসরু।

নওশাবা রিমান্ডে

তাছাড়া, অভিনেত্রী ও মডেল কাজী নওশাবা আহমেদের বিরুদ্ধে একইরকম অভিযোগে রোববার দুপুরে উত্তরা পশ্চিম থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা করেছে র‍্যাব।