বিএনপিকে জড়ানোর চক্রান্ত করছে সরকার

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সরকার বিএনপিকে জড়ানোর চক্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিভিন্নভাবে বিএনপিকে কিছু সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত করার অপপ্রয়াস শুরু করেছে। দুইদিন ধরে আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীরা যে ভাষায় কথা বলছেন এবং বিএনপিকে যেভাবে জড়ানোর চেষ্টা  করছেন তার উদ্দেশ্য একটাই। তারা ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন ভিন্নখাতে প্রবাহিত ও নস্যাৎ করে দিয়ে আবার গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ওপরে আক্রমণ শুরু করতে চায়। সেটা তারা করেছেও। কিন্তু আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, গণতন্ত্রের চর্চা করি।

আমরা কখনো কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপকে প্রশ্রয় দেই না। অতীতেও কখনো দেইনি ও এখনো দেই না।

গতকাল সকালে দলের নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। শনিবার ধানমন্ডি ও ঝিগাতলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার চিত্র তুলে ধরে মির্জা আলমগীর বলেন, নিরীহ কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের ওপর সরকার দলের লোকজন ধারালো অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হেলমেট পরে আক্রমণ চালিয়ে প্রচণ্ডভাবে আহত করেছে। এই সমস্ত নিরীহ অসহায় ছাত্রছাত্রীরা আশ্রয় নিতে গেলেও তাদের আশ্রয় দেয়নি পুলিশ। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, বেশকিছু শিক্ষার্থী মারাত্মকভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে গেছে। এএফপি বলছে, প্রায় একশ জনের মতো আহত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ অনির্বাচিত স্বৈরাচারী সন্ত্রাসী দল। তাদের কাছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। তিনি বলেন, কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রতারণার পর সরকারের কথা জনগণও বিশ্বাস করতে পারছে না, শিক্ষার্থীরাও বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ এই বিশ্বাসযোগ্যতা তারা হারিয়ে ফেলেছে। সেজন্য সারা দেশে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা বড়দের শিক্ষা দিয়ে ওরা মাঠে নেমে এসে তাদের দাবি আদায়ে আন্দোলন করছে। মির্জা আলমগীর বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জাতিকে শিক্ষা দিয়ে দিয়েছে। কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা জাতির চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

এখন সরকার হটাতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বড়দেরই মাঠে নেমে আসতে হবে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই ব্যর্থতা শুধু পরিবহনখাতে নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যর্থ এ সরকার। সংসদ নেই, বিরোধী দল নেই, প্রশাসন সম্পূর্ণ দলীয়করণ করে ফেলেছে। সরকার নির্বাচন কমিশন শেষ করে দিয়েছে, বিচার বিভাগকে শেষ করেছে। এই রাষ্ট্রকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। আমরা সমগ্র দেশের মানুষের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, জাতির উপর চেপে থাকা এই জগদ্দল পাথর সরানোর জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে এই পাথরকে, এই স্বৈরাচারী সরকারকে সরাতে হবে।

বিকৃত কণ্ঠস্বর দিয়ে এটি তৈরি, তবে অডিও বার্তা সমর্থন করি
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামে যে অডিও প্রকাশ করা হয়েছে তা বিকৃত কণ্ঠস্বর দিয়ে তৈরি বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই সরকারের দুরাচার সকলে জানে। নিজেরাই ঘটনা তৈরি করে সেই দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। অতীতেও সরকার আন্দোলন ভিন্নখাতে নিতে বিএনপিকে জড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছে। আপনারা দেখেছেন, আন্দোলনগুলো নস্যাৎ করার জন্য নিজেরা গাড়ি জ্বালিয়ে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়েছে। এবারও একই পন্থা বেছে নিয়েছে। মূলত তারা দেশের জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মির্জা আলমগীর বলেন, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কী বলেছেন শুনিনি। যতদূর শুনেছি, তাতে তিনি বলেছেন, বসে আছো কেন? ছাত্রদের সঙ্গে মাঠে নেমে পড়ো। এ কথাটি কোন পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, সেটা ওই কথোপকথনে উল্লেখ নেই। বিএনপি মহাসচিব প্রশ্ন রেখে বলেন, চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর যে কথোপকথন ফাঁস হয়েছে তাতে তার অপরাধটা কোথায়?

সমস্ত দেশই তো তাদের পক্ষে। আমরা আগেই শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছিলাম। শিক্ষণীয় আন্দোলন করছে তারা। দেশের সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পুলিশ, বুদ্ধিজীবী সবাই বলছে এ আন্দোলন যৌক্তিক। তাহলে তার দোষ কোথায়? তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনরাই আমীর খসরুর নামে যে অডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে, তার নায়ক। অতীতেও তারা আমাদের নেতাদের কণ্ঠ নকল করে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। এবারও কণ্ঠস্বর বিকৃত করে এটি তৈরি করার সম্ভাবনাই বেশি। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে অডিওতে যে বার্তা এসেছে, সেটিকে আমরা সমর্থন করি। কারণ, সংবাদ সম্মেলন করেই আমরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছি। তিনি বলেন, শনিবার রাতে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করার জন্য তার বাসায় দুইবার অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। আমাদের ছাত্রদলের নেতাদের বাসায় বাসায় তল্লাশি ও তাদের গ্রেপ্তার করেছে। যেখানে গ্রেপ্তার করতে পারেনি সেখানে তাদের পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করেছে। তিনি বলেন, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমাদের দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক একজন মন্ত্রী ও একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তার বাসায় বার বার পুলিশি তল্লাশি- এটাকে আমরা দলের উপরে এবং গণতন্ত্রের উপর হামলা বলে মনে করি। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

বার্নিকাটের গাড়িতে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার দাবি
বিএনপি মহাসচিব বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট শনিবার সুজনের পরিচালক বদিউল আলম মজুমদারের মোহাম্মদপুরের বাসায় নৈশভোজে গিয়েছিলেন। নৈশভোজের পর তিনি যখন বাসা থেকে বের হওয়ার জন্য তৈরি হন ঠিক তখনই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সেখানে জড়ো হয়। তারা গেইট ধাক্কাধাক্কি করে। যখনই বার্নিকাটের গাড়ি সে বাড়ি থেকে বের হয় তখনই তার গাড়ি আক্রমণ করে, ইটপাথর ছুড়ে। এ ঘটনায় তার গাড়িচালক আহত হন। ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীর কারণে রক্ষা পেয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের জীবন। মির্জা আলমগীর বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি। সে দেশের রাষ্ট্রদূতের ওপরে আক্রমণ হওয়া মানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ হওয়ারই শামিল বলে আমরা মনে করি। তিনি বলেন, সুজনের সম্পাদক বদিউল আলমকে আমরা সবাই চিনি। তিনি একজন অত্যন্ত দেশপ্রেমিক ও স্পষ্টবাদী মানুষ। তিনি কাজ করছেন রাষ্ট্রকে কী করে সুসংগত করা যায়, গণতন্ত্রকে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া যায়, নির্বাচন ব্যবস্থাকে কি করে এখানে গণতন্ত্রের উপযোগী করা যায় সেসব বিষয়ে।

এমন প্রতিথযশা ব্যক্তিত্বকে ও তার বাড়িতে আক্রমণ এবং তার ছেলের ওপর আক্রমণ হয়েছে। এটা আমরা মুক্ত চিন্তার ওপরে আঘাত মনে করি। এই হামলার ঘটনায় বিদেশে বাংলাদেশ সম্পর্কে খারাপ বার্তা যাবে। এ হামলায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। কূটনীতিকভাবে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মার্সিয়া বার্নিকাটের গাড়িতে আওয়ামী লীগের লোকজন হামলা করেছে অভিযোগ করে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানান বিএনপি মহাসচিব। সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু, নাজিমউদ্দিন আলম, আবদুস সালাম আজাদ, আবদুল করীম শাহীন, শাহিন শওকত ও আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন উপস্থিত ছিলেন।