চাঁদা না পেয়ে পাবনায় কলেজ অধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের পেটাল ছাত্রলীগ

চাঁদার টাকা না পেয়ে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের প্রকাশ্যে মারধর ও লাঞ্ছিত করেছেন উপজেলা ও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বৃহস্পতিবার বিকালে কলেজ ক্যাম্পাসের এ ঘটনায় শুক্রবার ঈশ্বরদী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মামলায় উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রাকিবুল হাসান রনি ও সাধারণ সম্পাদক সুমন দাস এবং কলেজ শাখার সভাপতি খন্দকার আরমান ও সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হাসানসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কলেজের সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই ঈশ্বরদী উপজেলা ছাত্রলীগ নেতারা কলেজের নামে প্রসপেক্টাস ও পাঠ্যসূচি প্রিন্ট করে নিয়ে এসে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্তি হতে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিক্রি করতে কলেজ কর্মচারীদের বাধ্য করেন।

বিক্রির সব টাকা তারা হিসাব-নিকাশ না করেই নিয়ে যান। কলেজ অধ্যক্ষ বিষয়টি অবগত হলে এই অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রনি তার দলবল নিয়ে কলেজ অধ্যক্ষের কাছে প্রস্পেক্টাস ছাপার টাকা চাঁদা হিসেবে দিতে বলেন।

এতে সম্মত না হওয়ায় ভাঙচুর ও অকথ্য গালিগালাজ করে শিক্ষকদের মারধর করেন তারা। এসময় কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আবদুস সবুর, উপাধ্যক্ষ আবদুল জলিলসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক আহত হন।

ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুরালী মোহন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমি মূলত ভর্তির দায়িত্বে থাকার কারণে মারধরের সময় ছিলাম না। তবে পরে এসে দেখি, স্যারের রুমে ভাঙচুর হয়েছে। এ ঘটনায় স্যার বাদী হয়ে একটি মামলাও করেছেন।

এ বিষয়ে কলেজের উপাধ্যক্ষ আবদুল জলিল বলেন, আমরা অন্যায় কাজের বিরোধিতা করলেই আমাদের উপর নির্যাতন নেমে আসে। ছয় ঘন্টা মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন করে তারা।

তিনি বলেন, আমি কেবল অধ্যক্ষ স্যার একজন প্রফেসর ও ডক্টরেট করা ব্যক্তি উল্লেখ করে তার গায়ে হাত তুলতে নিষেধ করায় আমার গলা ধরে দম বন্ধ করে দেয়ার উপক্রম হয় বলেই হামলকারীরা থেমে যায়।

উপাধ্যক্ষ আরও বলেন, আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় মানসিক যন্ত্রনা নিয়ে এখানে আছি। আমরা কাউকে কিছু বলতেও পারছি না, সহ্যও করতে পারছি না।

কয়েকজন শিক্ষক কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, ছাত্রলীগ নেতাদের কথা মতো কাজ না করায় আমাদের উপর এই হামলা করে তারা। তাদের অন্যায় দাবি মেনে না নেয়ায় উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রাকিবুল হাসান রনি, সাধারণ সম্পাদক সুমন, কলেজ শাখার সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকসহ তাদের ক্যাডার বাহিনী নিয়ে অধ্যক্ষের রুমে গিয়ে এই হামলা চালায়।

এ সময় সিসি টিভি ক্যামেরা, অফিস টেবিলের কাঁচসহ অন্যান্য আসবাবপত্র ভাঙচুর করে তারা। অধ্যক্ষসহ উপস্থিত শিক্ষকদের মারধর এবং অধ্যক্ষকে হত্যার হুমকি দেয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগ নেতা রাকিব, সুমন, আরমান ও সাব্বিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ পুরো ঈশ্বরদীবাসী। তারই ধারাবহিকতায় তারা কলেজেও ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।

কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আবদুস সবুর খান বলেন, সরকারি কাজে বাধাদান, জীবনের নিরাপত্তা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আমি ঈশ্বরদী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছি। আমি কোনো প্রকার অন্যায় কর্মকাণ্ডের সাথে নেই।

তবে চাঁদা দাবি ও মারধরের কথা অস্বীকার করে কলেজ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির প্রতিবাদ করছেন বলে দাবি করেন ঈশ্বরদী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রাকিবুল হাসান রনি।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে কথা বলার সময় স্যারদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। শিক্ষকরা যদি এ ধরনের অপকর্ম করতেই থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলনে যাব।

জানতে চাইলে ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজিম উদ্দিন বলেন, কলেজ অধ্যক্ষ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।