অনিশ্চিতের পথে জিপিএ ৫

রাজধানীর উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর সড়কে ২০ নম্বর বাড়ির কয়েক তলা বেসরকারি একটি কলেজের হোস্টেল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ওই হোস্টেলে গত দুই বছর ধরে অবস্থান করে পড়ালেখা করত পাবনার মেয়ে শেফা আলম। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। ১৬ এপ্রিল ছিল তার জীববিজ্ঞান পরীক্ষা। শেফা ওই দিনও পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু বিকেলে হোস্টেল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের সাথে আলামত হিসেবে পুলিশ উদ্ধার করে শেফা আলমের আত্মহত্যার একটি চিরকুট। তাতে লেখা ছিল ‘আব্বু, আমি জীবনযুদ্ধে যাচ্ছি। যদি ফিরে না আসি, আমার লাশ কফিনে করে বাড়ি নিয়ে যেও। আমি তোমার কাছে প্রমিজ করেছিলাম এ প্লাস পাবো, আমি পারিনি। আমাকে মাফ করে দিও।’

ময়নাতদন্ত শেষে শেফার লাশ বাড়ি নিয়ে গেছে তার আত্মীয়স্বজন। শেফার চিরকুট এবং হোস্টেলের লোকজনের কথায় এটা পরিষ্কার, শেফার পরীক্ষা ভালো হচ্ছিল না। জীববিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়ে এসে সে হতাশার কথা প্রকাশ করেছিল তার রুমমেটের কাছে। পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে না পারার গ্লানি আর চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় শেফা। দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে তখন শেফা রান্না ঘরে গিয়ে আত্মহত্যা করে।

জিপিএ ৫ ট্র্যাজেডির শিকার শেফা একা নয়। গত বছরও জিপিএ ৫ না পেয়ে ফল প্রকাশের দিনই রাজধানীতে নিখোঁজ হয় এক এসএসসি পরীক্ষার্থী। পরে রেল লাইনের পাশে পাওয়া যায় তার লাশ। এখানেও আত্মহত্যার কারণ পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে না পারার চাপ আর গ্লানি। কারণ ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে তীব্র চাপ ছিল জিপিএ ৫ পেতেই হবে তাকে।

এ ছাত্রের মা তার নামপরিচয় গোপন রেখে একটি ভিডিও বার্তায় তুলে ধরেন সন্তানের আত্মহত্যার কারণ। ভিডিও বার্তায় তিনি তুলে ধরেছেন কিভাবে দিনের পর দিন ভালো রেজাল্টের জন্য তারা তাদের সন্তানের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ভালো রেজাল্ট এবং পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে না পারার চাপ ও মনোকষ্টে সন্তান পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেয় ফল প্রকাশের দিন।

ভিডিও বার্তায় ওই নারী সবার কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, পরীক্ষা আর পড়া নিয়ে সন্তানের ওপর যেন তাদের মতো আর কেউ বাড়াবাড়ি না করেন। সন্তানহারা এ মা জানিয়েছেন তার ছেলের পড়ালেখা আর ভালো রেজাল্ট নিয়ে কিভাবে তার স্বামীসহ পরিবারের সবাই তার সন্তানের ওপর বাড়াবাড়ি করেছে। প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। কিভাবে সারাক্ষণ তার ওপর খবরদারি করা হয়েছে। একপর্যায়ে তার স্বামী বলেই ফেলেছেন, জিপিএ ৫ না পেলে তিনি সন্তানের মুখ দেখবেন না। কারণ জিপিএ ৫ না পেলে তার মানসম্মান থাকবে না।

এভাবে দিনের পর দিন প্রচণ্ড চাপের কারণে বেশ আগেই তার ছেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সে দিকে কারো খেয়াল ছিল না। তিনি বলেন, পরিবারের সবার চাপের কারণে আমিও ছেলের ওপর প্রচণ্ড চাপ দিয়েছি অব্যাহতভাবে। কারণ ছেলে পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করলে আমাকেও দোষারোপ করা হবে। সে জন্য সারাক্ষণ শুধু আমরা সবাই তাকে বলেছি-পড় পড় পড় পড়। পড়তে হবে, পড়তে হবে, জিপিএ ৫ পেতে হবে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ নারী বলেছেন, আজ আমি জানি ভালো ফল করতে না পেরে, পরিবারের চাপে কত মনোকষ্ট নিয়ে আমার ছেলে এ পথ বেছে নিয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালে রাজধানীর বনশ্রীতে মাহফুজা মালেক নামে এক মা হত্যা করেন তার দুই সন্তান অরনী (১২) ও আমান (৭)কে। সন্তানদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। পড়াশোনায় ভালো না করলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে এ নিয়ে সবসময় ভাবতেন তিনি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানসিক দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতার কারণে তিনি তাদের হত্যা করেছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানান মাহফুজা।
পরীক্ষায় খারাপ ফলের জন্য মানসম্মানের কারণে ফল প্রকাশের পর আত্মহত্যার ঘটনা অতীতেও ঘটেছে। সাধারণত পরীক্ষায় ফেল করার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের দুয়েকটি ঘটনা তখন ঘটত ফল প্রকাশের পর। কিন্তু প্রথম বিভাগ না পাওয়ার কারণে তখন আত্মহত্যার কথা সাধারণত শোনা যেত না, যেমন এখন ঘটছে জিপিএ ৫ না পাওয়ার কারণে আত্মহত্যার ঘটনা।

অতীতে পড়ালেখা নিয়ে এত উদ্বেগ, এত অস্থিরতা ছিল না শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। পড়ালেখা নিয়ে ছিল না অভিভাবকদের মধ্যে আজকের মতো এত তীব্র এবং উৎকট প্রতিযোগিতা। পরীক্ষায় সন্তানের ভালো ফল হলে তা ভালো লাগে সব মা-বাবারই। কিন্তু এখন অনেক মা-বাবা সন্তানের ভালো ফল নিয়ে সামাজিক প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। তাতে এ অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে যে, অনেক মা-বাবা সন্তানকে ব্যবহার করছেন তাদের সামাজিক সম্মান রক্ষার জন্য। সন্তানের পরীক্ষার ফল এখন অনেক মা-বাবার জন্য প্রেসটিজ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সে জন্য ছোট ছোট সন্তান নিয়ে অনেক মা-বাবা তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। যেন পরীক্ষাটা সন্তানের নয়, মা-বাবার।
অনেক অভিভাবক এ প্রতিবেদকের কাছে কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই স্বীকার করেছেন সন্তান জিপিএ ৫ না পেলে সমাজে তাদের মানসম্মান থাকবে না। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষিত, সচ্ছল মা-বাবার ক্ষেত্রে এ ধরনের মানসিকতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাদের অনেকে বলেছেন, যে করেই হোক জিপিএ ৫ পেতেই হবে তাদের সন্তানকে। সে জন্য যা যা করা দরকার, যত টাকা খরচ করা দরকার, যত কোচিং প্রাইভেট দরকার তারা করবেন।

পরীক্ষায় ভালো ফল করতে না পারার পর যখন আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে তখন এটি কখনো কখনো সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। কিন্তু পরীক্ষায় ভালো ফল নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং পরিবারে ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা তীব্র শারীরিক আর মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তা অগোচরেই রয়ে যাচ্ছে সবার। পড়া মুখস্থ করা আর পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য প্রায় প্রতিদিন মা-বাবার কাছে মার খেতে হয় প্রাইমারি শিক্ষার্থীদের। শারীরিক নির্যাতনের বাইরে রয়েছে তীব্র ভর্ৎসনা আর পড়ার চাপের মানসিক পীড়ন।

সন্তানের পড়ালেখা আর ভালো ফল নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা সর্বব্যাপী বিস্তার ঘটিয়েছে পঞ্চম শ্রেণি শেষে সমাপনী এবং অষ্টম শ্রেণি শেষের জেএসসি পরীক্ষা। আগে শুধু এসএসসি এবং এইচএসসি নামে দুইটি পাবলিক পরীক্ষা ছিল উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত। কিন্তু এখন চারটি পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। শিক্ষার্থী, অভিভাবক আর শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা বিরাজ করছে সমাপনী আর জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে। এক দিকে পরীক্ষার চাপ, ঘনঘন পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্র্ত, সৃজনশীল পদ্ধতি, প্রশ্নফাঁসের নৈরাজ্য, কঠিন পড়া ও প্রশ্নপদ্ধতি সব কিছু মিলিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে শিক্ষা খাতে। বিভিন্ন কারণে পারিবারিক নানা অশান্তির সাথে এখন শিক্ষা নিয়ে অস্থিরতা পরিবারে যোগ করেছে অশান্তির নতুন মাত্রা। ঘরে ঘরে চলছে সন্তানের পরীক্ষা নিয়ে অস্থিরতা আর নানা ধরনের অশান্তি। এ অবস্থা দীর্ঘদিন বিরাজ করলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক অভিভাবক।