একাদশ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলই টেনশনে

লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৫ আসন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু সেই নির্বাচন নিয়ে অনেক আগে থেকেই মাঠে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতাদের দৌড়ঝাঁপ চোখে পড়ার মতো। সে হিসেবে নির্বাচনী মাঠের চেয়েও বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতারা মামলা নিয়েই দৌড়ঝাঁপ করছেন দেশের উচ্চ থেকে নিম্ন আদালতে। বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে বন্দির পর মুক্তি সংগ্রামেও দিন কাটছে বিএনপি নেতাদের।

তবুও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছেন বিএনপি মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।
আওয়ামী লীগ সাতকানিয়া-লোহাগাড়া নির্বাচনী এলাকায় নানা উপলক্ষ নিয়ে শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যানার ও ফেস্টুন ঝুুলিয়েছেন। প্রকাশ করছেন এলাকার উন্নয়নে নিজের কৃতিত্বের কথা। দিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, মসজিদ-মাদ্‌রাসায় অনুদান।

পক্ষান্তরে বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নীরবে সামাজিক সংগঠন ও মসজিদ-মাদ্‌রাসার উন্নয়নে নিজেকে জড়িয়ে রাখলেও প্রকাশ্যে কোনো সভা-সমাবেশ করতে পারছেন না। বিদ্যুৎ গতিতে ছোটোখাট সভা-সমাবেশ করতে গেলেও পুলিশী বাধা বা হামলা চালিয়ে কর্মসূচি পণ্ড করে দেয়া হচ্ছে। জাতীয় উপলক্ষগুলোতে শুভেচ্ছা-স্বাগতম পোস্টার-ব্যানার করলেও নেতাদের মুক্তির দাবি সংবলিত পোস্টার ব্যানারই বেশি। তবে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশীদের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানান নেতাকর্মীরা।
লোহাগাড়া উপজেলার ৯টি ও সাতকানিয়া উপজেলার ১১টিসহ মোট ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৫ আসন। আসনটি বিএনপি-জামায়াত জোটের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন জামায়াত নেতা ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীকে কাছে টেনে অনেকটা কাকতালীয়ভাবে এ আসন দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। এর আগে প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে হয় বিএনপি; না হয় জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করেন এ আসন থেকে।
তাই বিএনপি ও জামায়াত জোট চায় আসনটি পুনরুদ্ধার করতে। আওয়ামী লীগ চায় জয় আঁকড়ে ধরতে। ফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াত জোট দু’পক্ষই এই আসন নিয়ে রয়েছেন টেনশনে।

আওয়ামী লীগের টেনশনের কারণ, বর্তমান সংসদ সদস্য ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর জনসমর্থন তেমন নেই। জামায়াত ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ায় তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ। তাছাড়া জামায়াতের লোক হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজনও তাকে বিশ্বাস করে না।
আবার সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বনফুল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মোতালেবকেও সজ্জন হিসেবে দেখেন না অনেকে। সেদিক থেকে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আলহাজ আমিনুল ইসলাম আমিন দল ও তৃণমূলে ভালো অবস্থানে রয়েছেন।

এ ব্যাপারে আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমুল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে সবসময় ছিলাম, আছি এবং থাকবো। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে আমাকেই দেখতে চান।
বনফুল ও কিষোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ মোতালেব বলেন, আমি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে জড়িয়ে রেখেছি। আগামী নির্বাচনে দল আমাকে মনোনয়ন দিলে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে এ আসনটি উপহার দিতে পারবো ইনশাআল্লাহ্‌।
অধ্যাপক আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন নদভী বলেন, এমপি হওয়ার পর আমি এলাকায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন করেছি। আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেও এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছি। তৃণমূল নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে রয়েছেন। আশা করছি আগামী সংসদ নির্বাচনেও আমিই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবো।
অন্য কথা বলছেন লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দীন হিরু। তারা বলেন, এমপি নদভী উপজেলা আওয়ামী লীগকে পাস কাটিয়ে তার আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে সরকারি উন্নয়ন, বরাদ্দ ও সভা-সমাবেশসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিজের খেয়াল-খুশিমতো চালাচ্ছেন।

এছাড়া এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মিনহাজুর রহমান, রূপালী ব্যাংকের পরিচালক ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও জেলা পিপি এডভোকেট একেএম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী।
এদিকে বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন ৪ জন। এরা হলেন- চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক শেখ মো. মহিউদ্দীন, জেলা বিএনপি’র প্রচার সম্পাদক নাজমুল মোস্তফা আমিন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ও সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান মুজিব।
অধ্যাপক শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দীন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় বিএনপি’র রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে আসছি। সিনিয়রিটির দিক থেকে আমিই মনোনয়ন দাবিদার। আশা করি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে আমাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করবেন।

নাজমুল মোস্তফা বলেন, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার প্রতিটি ওয়ার্ডে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ সব অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করছি। আশা করি, দল আমাকে মনোনয়ন দিয়ে কাজের মূল্যায়ন করবে। এদিকে দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সম্পাদক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ও সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান মুজিব এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

এছাড়া জামায়াতের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলনা আ.ন.ম শামসুল ইসলাম ও সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী।

জামায়াতের সাবেক এমপি আ.ন.ম শামসুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে আদৌ নির্বাচন হবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। হলেও কেয়ারটেকার সরকার ছাড়া নির্বাচন অবাধ ও সষ্ঠু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আগে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হোক, তারপর আসবে প্রার্থিতার প্রসঙ্গ।

আবার ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এলডিপি’র চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীরবিক্রমও মনোনয়ন চাইতে পারেন এমন গুঞ্জনও রয়েছে।

১৯৯১ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করেন তৎকালীন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। তিনি জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে হেরে যান। ১৯৯৬ সালে আবার শাহজাহান চৌধুরীকে হারিয়ে জয়লাভ করেন বিএনপি’র কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ। আওয়ামী লীগের মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী তৃতীয় হন। ২০০১ সালে কর্নেল অলি ও শাহজাহান চৌধুরী দু’জনই চারদলীয় জোটের মনোনয়ন চেয়ে বসেন। শেষ পর্যন্ত দু’জনই ভোটের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। কর্নেল অলি ও আওয়ামী লীগের জাফর আহমদ চৌধুরীকে হারিয়ে শেষ হাসি হাসেন শাহজাহান চৌধুরী। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে কর্নেল অলিকে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নেন জামায়াতের আ.ন.ম. সামশুল ইসলাম।