সমাজ এগিয়ে যাক সম্পর্কের মর্যাদায়

সেদিন বাংলাদেশের একটা মেডিকেলের মর্গে ১২টি মৃত দেহ দেখলাম যার সবকয়টিই অপমৃত্যু। তিনটি সড়ক দূর্ঘটনার কারণ ছাড়া বাকিসবগুলোর কারণ ব্যক্তিগত, পারিবারিক। বুঝায় যাচ্ছে, সময়টা খুব অস্থির। আর এই সময়কে হারানোর নেশায় মানুষগুলোও দিন দিন খুব অস্থির হয়ে যাচ্ছে। সময়কে হারাতে গিয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত একে অপরকে হারানোর নেশায় বুঁদ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিনিয়ত নানা মৃত্যুর মিছিলে। অদ্ভুতভাবে আক্রমণাত্মক, অসংবেদনশীল, অমানবিক, অতৃপ্তি। এ সব আচরণ আজ সমাজে মরণনেশার মতো বিরাজমান। আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের, ভাইয়ের-বোনের, বন্ধুদের, সাথীদের সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব বাড়ছেই। শুরুটা একদম ছোট কারণে হলেও একটা সময় সেটা বড় আকার ধারণ করছে। সবাইই যেন, মানুষ যে সমষ্টিক প্রাণী তা ভুলে গিয়ে ব্যক্তিতে প্রাণী হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। এর মধ্যে কেউ যদি সমষ্টিক প্রাণী হিসেবে গড়েও তুলতে চায় তাহলে সেও হয়ে উঠেন অনেকের আক্রমণের বস্তু।

নানা কারণেই মানুষ তার স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা, মানবিকতার বিপরীতে নিজের অজান্তেই মরণ নেশার মতো আক্রমণাত্মক, অসংবেদনশীল, অমানবিক আচরন অস্বাভাবিক আচরণে ব্যাপ্তি ঘটাচ্ছে। অনেকে আবার ব্যক্তিগত ক্ষোভের যায়গা থেকে এইগুলোতে বুঁদ হচ্ছেন। আবার সমষ্টির গড়ে উঠার মধ্যেও আছে এক ধরণের কেন্দ্রিকতা। উদাহরণ স্বরূপ, যে মানুষটি খেলাধুলা পছন্দ করে তার বন্ধু শুধু খেলাধুলা করা মানুষেরা এর বাইরে কিন্তু তেমন কেউ নয় কারণ সে আর কোন কিছুর সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছেন না বা খাপ খাওয়ানোর সুযোগটা পাচ্ছেন না। আবার দেখবেন, সমাজে যারা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবী করেন তারাও নির্দিষ্ট একটা গণ্ডির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন। ভিন্নমত, ভিন্নচিন্তা বা প্রগতিশীল হয়েও ভিন্নযুক্তির মানুষের সাথে একধরনের দূরত্ব বজায় রাখেন। অথচ এই অমানবিক সময়ে তারাই হতে পারতেন সবচেয়ে মানবিক। আর ছড়িয়ে দিতে পারতেন, মানবিকতাকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। কিন্তু তারাও তো মানুষ, তাই তারাও হয়ে আছেন সম্পর্কের মর্যাদাহীন সমাজের বাসিন্দা।

উপরের দুটি উদাহরণ দিলাম কারণ সমাজে এই দুই ভাগের মানুষেরই সমাজের বেশীরভাগ অংশের সাথে চলাফেরা, মেলামেশা করার। অথচ সেটা না হওয়া এবং ক্রমাগত নানা চাপে বাড়তে থাকা ব্যক্তির একা হয়ে উঠার, নিজেকেই আমিত্বের যায়গায় চিন্তা করার ফলে সমাজে কমছে সম্পর্কের মর্যাদা। বাড়ছে ব্যক্তিগত দূরত্ব। আর এই দূরত্ব শিকলে বন্দি হয়ে বৈশ্বিক অনেক সুবিধা থাকার পরেও মানুষ একা হয়ে পড়ছে। আর ঘটছে নানা অঘটন। যা হয়তো বা কেউ কোনদিনই কামনা করে না।

যা বুঝা যায় কেউ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে। পরিবার, বন্ধু, শুভান্যুধায়ী, এমন কি যারা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষটিকে জীবিত অবস্থায় নানা আক্রমণ, অসম্মান, অবহেলা করেন এই রকম মানুষগুলোসহ আশেপাশের বেশীরভাগ মানুষ তখন সেই চলে যাওয়া মানুষটির জন্য আফসোস করেন। নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করেন। কিন্তু তখন আসলে কারো কিছুই করার থাকে না। মানুষটির সাথে সাথে সবকিছুই তখন শেষ হয়ে যায়। অথচ সেই মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে হয়তো চলে যেতো না যদি মৃত্যুর পর আফসোস করা বা চলে যাওয়া মানুষটিকে নিয়ে কথা বলা লোকজনেরা একটু সম্পর্কের মর্যাদাটা দিতেন। হাতে গোনা মানুষের যায়গায় যদি সে মানুষটি যদি অনেক মানুষের মাঝে নিজেকে খুঁজে পেতেন তাহলে এমন নাও হতে পারতো।

আর এতো কিছুর পাশাপাশি আজকাল পূঁজি, অর্থের পিছনে অপ্রতিরোধ্য ছুটে চলার ফলে সমাজে বাড়তে থাকা বৈষম্য মানুষকে আরও মানসিকভাবে একদম নিঃস্ব করে ফেলছে। যা আমরা বেঁচে থাকতে একদম বুঝতে পারছি না। ভয়াবহভাবে আমাদের সমাজে বর্তমানে একাকীত্ব বাড়ছে। অপমৃত্যু বাড়ছে। একটু আশেপাশে খোঁজ নিলেই তা পাওয়া যাবে। অথচ এমনটা অন্তত পক্ষে আমাদের দেশে হওয়ার কথা ছিলো না। কারণ আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস একা একার নয় বরং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু আমরা ” উন্নত জীবন ” যাপন, অমুকের সাথে তমুকের প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে নিজেস্বতা হারিয়ে ফেলছি। আমরা সবাই যদি প্রত্যেকটি সম্পর্কের প্রতি মনোযোগী হতাম, সম্পর্কগুলোকে মর্যাদা দিতাম তাহলে এমন হতো না। মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে ছোট করতে গিয়ে আমরা দিন দিন মানুষের সমাজকেই আকারে ছোট করে ফেলছি। আর মানুষ যতদিন এটা নিজেরা উপলব্ধি করবে না ততদিন তাদের চেনা-পরিচিত মানুষটিকেও হারাতে খুব বেশী দেরি হবে না।

সবশেষে আসলে সমষ্টিক মানুষই সমাজের মূল কারিগর। ইতিহাসের নির্মাতা। তাই যদি সমষ্টিক মানুষই সম্পর্কের মর্যাদা না দেয় তাহলে সকল মানুষকেই একদিন এর ভয়াবহতা ভোগ করতে হবে। আর ক্ষুদ্র যে কয়েকজন মানুষ সমাজের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখার জন্য সম্পর্কের মর্যাদা দেন তারা নিজেরাও আর টিকতে পারবে না। তখন হয়তো “মানুষের সমাজ”টাই আর টিকে থাকবে না।

তাই নিজেদের প্রয়োজনেই আমাদের উচিৎ আশেপাশের সকলের সম্পর্কের প্রতি মর্যাদাশীল হওয়া, সকল ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। অন্ধ আবেগ নয় বোধসম্পন্ন আবেগ দিয়ে পথচলা।

লেখক: রায়হান তাহারাত লিয়ন