জ্ঞানী ও অজ্ঞ সমান নয়

প্রেসটাইম২৪: সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি কলমের মাধ্যমে শিখিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন এমনসব বিষয় যা সে জানত না। আল্লাহকে যথাযথ ভয় করুন, মজবুত অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরুন। ‘হে যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহকে যথাযথ ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’

হে ইসলামের উম্মাহ! আল্লাহ শিক্ষা ও শিক্ষিত লোকদের মর্যাদা উন্নত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে, আর যাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উপরে উঠিয়েছেন।’
তিনি আরো বলেছেন, ‘বল, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান? শুধুমাত্র বুদ্ধি ও জ্ঞানসম্পন্ন লোকরাই উপদেশ গ্রহণ করে।’

ইসলাম-পূর্ব আরব জাতি ছিল একটি অপরিচিত জাতি। তাদের কোনো নেতৃত্ব ছিল না। জাতি হিসেবে কোনো লক্ষ্য ছিল না। তাদের মধ্যে ছিল অজ্ঞতা, মূর্খতা ও কুসংস্কার। তাদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল গোত্রীয় বর্ণবাদ। এমন এক অবস্থায় আল্লাহ তাঁর করুণা ও মেহেরবানিতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে পাঠালেন। তাঁর মাধ্যমে মানব জাতিকে অন্ধকার থেকে বের করে আলো, পার্থিব সঙ্কীর্ণতা থেকে বের করে পৃথিবী ও পরকালের প্রশস্ততার দিকে নিয়ে এলেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন শিক্ষক, অভিভাবক, পরিশুদ্ধকারী ও নৈতিকতার পূর্ণতাদানকারী হিসেবে।

আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের সামনে তার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করেছে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেছে আর তাদেরকে শিখিয়েছে কিতাব ও হিকমাহ তথা প্রজ্ঞা। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন কোমল ও মহানুভব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ আমাকে কঠিন ও রূঢ় করে পাঠাননি। বরং পাঠিয়েছেন সহজ-সরল শিক্ষক হিসেবে। (সহিহ মুসলিম)

সাহাবি মুয়াওবিয়া বিন আল হাকাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন, ‘আমি একবার সালাতের মধ্যে কথা বলেছিলাম। সালাত শেষে তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, সালাতের মধ্যে কথা বলা ঠিক নয়। সালাত তো হলো তাসবিহ, তাকবির আর কুরআন তিলাওয়াতের জায়গা।’
আমার পিতা কুরবান হোক, আমি তাঁর আগে বা পরে এমন উত্তম শিক্ষক দেখিনি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে ধমক দিলেন না, মারলেন না, এমনকি কটুকথাও বললেন না।’ (সহিহ মুসলিম)

আল্লাহ তাঁর রাসূল সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ‘আমি তোমাকে পাঠিয়েছি বিশ্বজাহানের জন্য করুণাস্বরূপ।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষাদানে ছিলেন কোমল ও স্নেহপরায়ণ। শিক্ষা দানকালে শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে। সুনানু আবু দাউদে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয বিন জাবালের হাত ধরে বললেন, হে মু‘আয! আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি প্রত্যেক সালাতের পর বলবে, আল্লাহুম্মা আয়িন্নি আলা যিক্্রিকা ওয়া শুক্্রিকা ওয়া হুসনি ইবাতাদিকাÑ ‘হে আল্লাহ, আমাকে তোমার স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও তোমার উত্তম ইবাদাতের তাওফিক দাও।’

শিক্ষাদানের পরিবেশ যদি নিরাপদ হয়, তাহলে ছাত্র নির্ভয়ে ও নিঃসঙ্কোচে তার অক্ষমতা, দুর্বলতা ও সমস্যা শিক্ষকের কাছে প্রকাশ করতে পারে। ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন, সুলাইম নামে এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! দিনের বেলায় আমরা কাজ করি, আর রাতে আমরা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর মু‘আয বিন জাবাল আমাদের কাছে এসে সালাতের জন্য ডাকেন, আমরা তার কাছে আসি, তিনি আমাদেরকে নিয়ে লম্বা সালাত আদায় করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ডেকে বলেন, হে মু‘আয, তুমি মানুষের জন্য কষ্টের কারণ হয়ো না। তুমি আমাদের সাথে সালাত আদায় করবে। আর যদি লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করো তাহলে তাদের যেন কষ্ট না হয়Ñ এভাবে সালাত আদায় করবে।

হে মুরুব্বিগণ! উত্তম আদর্শ শিক্ষার্থীদের মন মানসে প্রভাব ফেলে। শিক্ষক যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে এটি তার ছাত্রদের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করবে। হে শিক্ষক ও শিক্ষিকা সমাজ! মর্যাদার দিক থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন আর কেউ নেই। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ আদম সন্তান। তিনি বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর বন্ধু, তিনি প্রথম সুপারিশকারী ও তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। তাঁর জন্য সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজা খোলা হবে। তিনি হাওজ ও প্রশংসনীয় অবস্থানের অধিপতি। তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন বিনয়ী।

আনাস রা: বলেন, সাহাবায়ে কিরামের কাছে আল্লাহর রাসূলের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কেউ ছিল না। অথচ তাঁকে দেখলে কেউ দাঁড়াতেন না। কেন না তাঁরা জানতেন যে, তিনি এটি পছন্দ করেন না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ছিল প্রশ্নোত্তর ও পর্যালোচনা।

ইমাম তিরমিযি বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিগণের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, ‘তোমরা কি জানো আমাদের মধ্যে নিঃস্ব কে?’ তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি যার কোনো অর্থসম্পদ নেই। তিনি বললেন, ‘বরং আমার উম্মাতের মধ্যে সে-ই নিঃস্ব যে কিয়ামত দিবসে সালাত, সিয়াম ও জাকাত নিয়ে আসবে আর বিপরীত দিকে সে পৃথিবীতে কাউকে গালি দিয়েছে, কারো চরিত্র হনন করেছে, কারো সম্পদ ভোগ করেছে, কাউকে হত্যা করেছে, কাউকে প্রহার করেছে। তার ভালো কাজ দিয়ে এদের প্রতিশোধ নেয়া হবে।

এক পর্যায়ে তার ভালো কাজগুলো শেষ হয়ে যাবে। তখন তাদের অপরাধসমূহ তার ওপর চাপানো হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ হে মুমিনগণ! একজন সফল শিক্ষক সবসময় অবস্থাভেদে ছাত্রদের সাথে আচরণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামÑ সাহাবিগণের অবস্থা বিবেচনায় রেখে উপদেশ ও পরামর্শ দিতেন। একজনকে উপদেশ দিতেন তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র বিষয়ে, আরেক জনকে উপদেশ দিতেন রাগ তথা ক্রোধকে দমন করতে।

তৃতীয় জনকে উপদেশ দিতেন মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ না করতে। চতুর্থ জনকে উপদেশ দিতেন আল্লাহর যিক্রে জিহ্বাকে সিক্ত রাখতে। সহিহ মুসলিমে একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার তাঁর একজন সাহাবির হাতে স্বর্ণের আংটি দেখলেন। তিনি নিজ হাতে আংটিটি খুলে নিয়ে ফেলে দিলেন এবং বললেন, তোমাদের মধ্যে যে অঙ্গার ধারণ করতে চাইবে সে হাতে এ ধরনের আংটি পরবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলে যাওয়ার পর লোকটিকে বলা হলো, আংটিটি উঠিয়ে নিয়ে অন্য কাজে লাগাতে। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি এটি আর উঠাব না, কেননা এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুড়ে ফেলেছেন। লোকদের অবস্থা বিবেচনায় রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করতেন।

প্রজ্ঞা সম্পন্ন শিক্ষক তো সে-ই, যিনি বর্তমান সময়ের সব ঘটনা সম্পর্কে অবগত থাকেন এবং ছাত্রদের সে অনুযায়ী নির্দেশনা দেন। চলমান কোনো বিশেষ ঘটনা বা পরিস্থিতিকে শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করলে তা তাদের হৃদয়ে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। সহিহুল বুখারি ও সহিহ মুসলিমে উমার রা:-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধবন্দী এক মহিলাকে দেখলেন, সে যেন বন্দীদের মধ্যে কাউকে খুঁজছে। মহিলাটি একটি শিশুকে খুঁজে পেয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো এবং তাকে দুধপান করাল। এ দৃশ্য দেখে তিনি আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের কী মনে হয়Ñ এ মহিলাটি তার এ সন্তানটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারবে? আমরা বললাম, আল্লাহর কসম! না, সে এটি করতে পারবে না।’
তিনি বললেন, ‘আল্লাহ এ মহিলাটির চেয়েও তাঁর বান্দাদের প্রতি অধিক করুণাশীল।’

হে মুরব্বি সমাজ! ভুল সংশোধনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চমৎকার পন্থা অবলম্বন করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি সংশ্লিষ্ট লোকের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য নাম প্রকাশ না করে বলতেন, ‘লোকদের হলো কী? তারা এমন এমন কাজ করে!’
হে ইসলামের উম্মাহ! শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সকলের দায়িত্ব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জেনে রাখো, তোমাদের সবাই দায়িত্বশীল। আর প্রত্যেককে তার নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেসব নির্দেশনা জানলাম তা তাঁর বিপুল নির্দেশনাবলির মধ্যে মাত্র কয়েকটি।

তিনি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তার ফলস্বরূপ একটি ব্যতিক্রমধর্মী জাতি গঠন করতে পেরেছিলেন যার নজির পৃথিবীতে নেই। যে জাতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা সর্বোত্তম জাতি, তোমাদেরকে বের করে আনা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য; তোমরা কল্যাণের আদেশ করবে আর মন্দ থেকে বিরত রাখবে।’