দান করলে সম্পদ বাড়ে

প্রেসটাইম২৪: দান হলো দেয়া, বিলানো। দুনিয়ার কোনো বিনিময় ছাড়াই যে জিনিস অন্যকে নিঃস্বার্থভাবে দেয়া হয় তাকে বলা হয় দান। ঈমান, আমল ছাড়া পরকালে সম্পদ সঞ্চয়ের অন্যতম মাধ্যম হলো অসহায়ের সহায় এবং অভাবগ্রস্তের অভাব দূর করা, ভিুককে ভিা দেয়া। আর এটা হয়ে থাকে দান করার মাধ্যমে। দানের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি পায়, গচ্ছিত সম্পদ হেফাজতে থাকে। বিপদ-আপদ থেকে রা পাওয়া যায়। বান্দার দান তার ওপর আল্লাহর ক্রোধকে সংবরণ করে। তাই এমনভাবে দান করা উচিত, যেন ডান হাতের দান বাম হাতেও জানতে না পারে। অর্থাৎ কাউকে দেখানোর জন্য দান করা হলে সে দান অহঙ্কারের কারণ হবে। কাজেই সে দিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা বাঞ্ছনীয়।

শত নেকি অর্জনের নিমিত্তে অভাবীদের প্রতি দানের হাত প্রসারে পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারার ১৬১ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘যারা নিজেদের ধনৈশ্বর্য আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি শস্যবীজ, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে এক শ’ শস্যকণা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’

প্রিয় জিনিস ব্যয় করার ব্যাপারে আল্লাহ চির অবহিত আর কেউ ততণ পর্যন্ত পুণ্য লাভ করতেও পারবে না যতণ প্রিয় জিনিস থেকে দান না করা হবে। সে ব্যাপারে সূরা আলে ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেÑ ‘তোমরা যা ভালোবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না। তোমরা যা কিছু ব্যয় করো আল্লাহ সে ব্যাপারে সবিশেষ অবহিত।’

আল্লাহ তায়ালা অভাবী, দুর্বল ও অসহায়-অনাথ ব্যক্তিদের নিরপরাধ সাব্যস্ত করে পবিত্র কুরআনে সূরা তাওবার ৯১ নম্বর আয়াতে বলেনÑ ‘যারা দুর্বল, যারা পীড়িত এবং যারা অর্থসাহায্যে অসমর্থ, তাদের কোনো অপরাধ নেই, যদি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের অবিমিশ্রিত অনুরাগ থাকে, যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো হেতু নেই। আল্লাহ মাশীল পরমদয়ালু।’
হাদিসে এসেছেÑ ‘যে দুনিয়াতে কোনো মানুষের অভাব দূর করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার অভাব দূর করবেন।’
সাহাবায়ে কেরামের জমানায় কোনো ভিুকের আগমন ঘটলে তারা মারহাবা ও অভিনন্দন জানাতেন। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘হজরত আলী ইবনে হুসাইন রা:-এর কাছে যখন কোনো ভিুক আসত তখন তাকে মারহাবা ও স্বাগতম জানাতেন এবং বলতেন, এরা আমার সম্পদ ইহকাল থেকে পরকালে স্থানান্তর করে দিচ্ছে।’ (কিতাবুল বির, পৃ : ২১৬)।

দুনিয়ার বুকে অনেক ভিুকই আছেন, যারা আসলে কোনো ভিুক নন। যদিও তারা মানুষের রূপ ধরে আসেন। কারণ, এর দ্বারা মানুষকে আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রাপ্ত নেয়ামতের ওপর পরীা চালিয়ে থাকেন।
হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রা: থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা: ইরশাদ করেন, মানুষের নিকট কখনো কখনো এমন ভিুক আসে যারা মানবও নয়, জিনও নয়, বরং তারা আল্লাহর ফেরেশতা। যাকে দিয়ে মানুষকে খোদাপ্রদত্ত নেয়ামতের ওপর পরীা চালানো হয় যে তারা কোন ধরনের আচরণ করে। (কিতাবুল বির, পৃ : ২১৬)।
হজরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা: থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা: ফরমান, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে প্রার্থনা করবে, তাকে আশ্রয় দান করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে সাহায্য তলব করবে, তাকে সাহায্য করবে। যে ব্যক্তি তোমাকে উপকার করবে, তার প্রতিদান দেবে। যদি কোনো প্রতিদান দিতে না পারো, তাহলে তার জন্য দোয়া করতে থাকো; যত দিন পর্যন্ত না তোমার বিশ্বাস জন্মাবে যে, তুমি তার প্রতিদান পূর্ণ করে দিয়েছ। (আবু দাউদ, পৃ : ২৩৫)।
আল্লাহর নামে ভিা চাওয়ার পরও অনেকে এটাকে প্রতারণা, ধোঁকা ইত্যাদি বলে কেটে পড়েন। অথচ দান করা হলে তা কোনো দিন বিফলে যাওয়ার অবকাশ নেই। কারণ যে ধোঁকা দিয়েছে, তিগ্রস্ত সেই হবে। আর যে দান করেছে সে পরকালে বিজয়ী হবে। এ েেত্র হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা: ইরশাদ করেন, ‘মানুষের মধ্যে নিকৃষ্ট ব্যক্তি কে বলব কি? আমরা বললামÑ জি, হ্যাঁ! রাসূল সা: বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দোহাই দিয়ে চায় এবং তাকে যে না দেয়।’ (নাসায়ি, পৃ : ২৫৮)।
ভিুককে ফিরিয়ে না দেয়ার ব্যাপারেও হাদিসে অনেক সাহাবায়ে কেরামকে ল্য করে উম্মতের নির্দেশনার জন্য উৎসাহমূলক আলোচনা এসেছে।

হজরত হাছান বসরি রহ: বলেন, ‘মানুষের মধ্যে একটি শ্রেণীকে (সাহাবায়ে কেরাম) পেয়েছি, যারা ঘরের লোকদের গুরুত্ব সহকারে বলে দিতেন যে, কোনো ভিুককে যেন ফেরত না দেয়া হয়।’ (কিতাবুল বির, পৃ : ২১৬)।
অথচ আজ আমাদের সমাজ এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে যে কে ভিুক ও কে ধোঁকাবাজ, তা চেনাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তায় রাস্তায়, নামাজ শেষ হলে মসজিদের দরজায় সর্বত্রই ভিুকের আনাগোনা। অবশ্য দু-একজন বিকলাঙ্গ ছাড়া বাকি সবাই প্রত্যভাবে সুস্থ। তাদের ভেতরের অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন। এরপরও কেউ তাদের খাঁটি মনে নেক নিয়তে সামান্য কিছু দান করলেও এর প্রতিদান পাহাড় পরিমাণ হবে।

আর কেয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগ পর্যন্ত কাউকে এক পা এগিয়ে যেতে দেয়া হবে না। ১. জীবন কিভাবে ব্যয় হলো, ২. যৌবন কোন কাজে ব্যয় হলো, ৩. কিভাবে রোজগার করেছে, ৪. কোথায় কোন কাজে ব্যয় করেছে এবং ৫. ইলম অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে। সুতরাং হালাল উপায়ে রোজগার তথা আয়ের মাধ্যমে আমাদের ব্যয়ের খাতও যদি দানের মধ্যে থাকে, তবে পরকালে এর জন্য আল্লাহর প থেকে রয়েছে উত্তম বিনিময়।

সমাজের প্রতিটি অধ্যায়ে অনাথ-অভাবীদের প্রতি বিশেষ গুরুত্বদান অত্যাবশ্যক। এটাই রাসূলের শিা। কাজেই প্রকৃত অসহায়-অভাবীদের প্রতি কুরআন-হাদিসে দানের নির্দেশনা অনুযায়ী দানের হাত সম্প্রসারণ করার মধ্যে রয়েছে সফলতা। দুনিয়ার এ অর্থসম্পদ ব্যয় হোক সঠিক পথে, সঠিক উপায়ে। সবার মধ্যে তৈরি হোক অন্যের প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টিভঙ্গি।